একটা রঙহীন জীবনের গল্প

একটা রঙহীন জীবনের গল্প

# একটা রঙহীন জীবনের গল্প #

ছেলেটা এখন অনেক বড়ো অফিসার। এতিমখানা মাদ্রাসায় বড় হয়েছে। প্রতি ঈদের সময় যখন সহপাঠীদের মা, বাবা সন্তানদের জন্য যখন নতুন নতুন কাপড়চোপড় নিয়ে আসতো এবং তাদের সন্তানদের কে ঈদে বাড়িতে নিয়ে যেত রাফসানের তখন মাদ্রাসা ছাড়া এতবড় পৃথিবীটা তে তার কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল নাহ। সে জানত তার মা আছে, তার মা ৫ বছর বয়সে রাফসানকে ঘুরতে আনার নাম করে মাদ্রাসায় রেখে যায়। রফসান সেদিন বলেছিল- মা, কই যাও আমাকে নিয়ে যাবা না?

তার মায়ের উত্তর ছিল- বাবা তুমি এখানে বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করো আমি বিকালে এসে তোমাকে নিয়ে যাব। ৫ বছরের বাচ্চা রাফসান সেদিন খেলা শেষে মাদ্রাসার গেইটের সামনে যে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল এই ভেবে যে মা আসবে! তার এই করুণ দৃষ্টির অপেক্ষা ছিল যুদ্ধ বিধস্ত দেশ থেকে এক জন সৈনিকের বেঁচে বাড়ি ফেরার মতোই স্তব্ধ বুকের হাহাকার চিৎকার!

সেদিন আর তার মা আসলো নাহ। ছোটো বাচ্চাটার কী যে ছটফটানি! যেন অর্ধেক মোরগ জবাইয়ের মতো। তবে সে আর্তচিৎকারের শব্দগুলো প্রাচীর ভেদ করে, বাইরের এই কয়লার পৃথিবীতে শোনা যায়নি। শুধু প্রাচীরটাতেই কম্পন করেছিল।

বাচ্চা রাফসান সেদিন নিজেকে প্রশ্ন করে, ‘আমার অপরাধ কী? আম্মু কেন আসলো না?’ বাচ্চা রাফসান মনে মনে সেদিন বলেছিল- মা, আমি আর দুষ্টুমি করবে না! তোমার আর নানাভাইয়ার সব কথাই আমি শুনব! প্লিজ মা, আমাকে নিয়ে যাও প্লিজ! তার এই আকুতি ভরা টলটলে চোখের ভাষা ছিল- আম্মু আমি আর দুষ্টুমি করব না। তোমার সব কথাই শুনব।

আরও পড়ুন: বই এবং বই পড়া 

সেদিন রাফসান মনে করেছিল তার দুষ্টুমির জন্য হয়তো তার মা তাকে ভয় দেখাচ্ছে। সে মায়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সেই দিন বিকেলে রাফসানের মা আর রাফসানের কাছে আসেনি। গিয়েছে তার প্রেমিক পুরুষের কাছে অর্থাৎ সেদিন রাফসানের মা অন্য এক পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। যার সাথে বিবাহ হয়েছে, সেই প্রেমিক পুরুষের কথাতেই রাফসানের মা তার ছেলেকে এই ভাবে ছেড়ে চলে যায়। রাফসানের বাবা একটি রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায় বছর দু এক আগে। তারপর থেকে রাফসানের মা, ছেলে কে নিয়ে তার বাবা বাড়িতেই থাকত।

তারপরে হঠাৎ এক দিন যখন সবাই নিজের মতো করে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে চলে যাচ্ছে তখন রাফসান মাদ্রাসার ছাদে গিয়ে একা একা কাঁদছে আর সাথে বন্ধুদের চলে যাওয়া দেখছে। দৃশ্যটা ছিল হৃদয় – বিদারক। ঠিক এমন সময়, মাদ্রাসা বাবুর্চি মোবারক কাকা এসে ওর কাঁধে হাত দিয়ে বলল- কেঁদো না বাবা, এই পৃথিবীটা বড়োই নির্মম! মানুষগুলোও কেমন জানি! কেউ একটা সন্তানের আশায় দেশ – বিদেশ কত দিকে যে ছুটোছুটি করছে! আর কেউ বা নিজের চাঁদ মুখটাকে এই ভাবে রাস্তায় ফেলে চলে যাচ্ছে। আসলে প্রতিটা মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে।

তেমনি মোবারক কাকার জীবনেও একটা গল্প আছে। মোবারক কাকার ছিল প্রেমের বিয়ে। কলেজে থাকতে রুপা নামের এক মেয়ের সাথে কাকার প্রেম হয়, প্রেম থেকে বিয়ে। ৮ বছর সংসার করার পর একটি মেয়েসহ মোবারক কাকার বউ অন্য এক পরপুরুষের সাথে পরকিয়ায় আসক্ত হয়ে পালিয়ে চলে যায়। ওই যে একটা কথা আছে না ভালোবাসার রঙ বদলায়! মোবারক কাকার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। তা না হলে কেউ প্রেম করে বিয়ে করে আবার অন্য কারও প্রেমে পড়তে পারে নাকি!

তবে মোবারক কাকা রাফসানকে অনেক ভালোবাসতো; নিজের ছেলের মতো করেই দেখত। মাদ্রাসার সব শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা যখন বাড়িতে চলে যেত, রাফসান আর মোবারক কাকা তখন এক সাথে মাদ্রাসায় থেকেই ইদ করত। বলতে গেলে রাফসানের মা, বাবা এখন মোবারক কাকাই। রাফসানকে সম্পূর্ণ নিজের ছেলের মতো দেখত তিনি।

রাফসানের পড়াশোনা প্রায় শেষ; একটা চাকরিও হয়েছে। মাদ্রাসা ছেড়ে তারা এখন ভাড়া বাসায় থাকে। ভালোই চলছিল; কিন্তু হঠাৎ করে মোবারক কাকা মারা যায়। রাফসান আবারও একা হয়ে যায়। বাস্তবতার কাছে শিখতে শিখতে সে আজ বড়োই বাস্তববাদী মানুষ।

এরপর অনেকগুলো দিন চলে যায়! তারপর সে তার এক কলিগকে বিয়ে করে। সবকিছু ভালোই কাটছে তাদের দিনগুলো! তারপর রাফসানের যে মা তাকে ৫ বছর বয়সে একা ফেলে যায়; সে মা রাফসানের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে। রাফসান বলে- আমার কোনো মা নেই। এতদিন পর মায়ের কণ্ঠ শুনে সে সেদিন অনেক কেঁদেছিল। পরে রাফসান শুনতে পায় যে, তার মা যে মানুষটার সাথে চলে গিয়েছিল সে মানুষটা তার মাকে অমানবিক নির্যাতন করেছে। শেষ পরিণতি বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে।

রাফসানের এখন অনেক টাকা, সে অন্য লোকের মাধ্যমে তার মায়ের খোঁজ নিয়ে দূর থেকে একটি বৃদ্ধাশ্রমে তার মাকে রাখার ব্যবস্থা করল। কিন্তু মায়ের কাছে যায়নি। এরপর ২০ বছরের পুরোনো পিতা – মাতাহীন দিনগুলোর কথা মনে করতে করতে খোলা আকাশের নিচে বসে কাঁদতে লাগল। আর চিন্তা করতে লাগল- মানুষের জীবন কতই না অদ্ভুত!

গল্পের নাম: একটা রঙহীন জীবনের গল্প

লেখা: ফকির মুহাম্মদ শুভ ইসলাম।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

1 thought on “একটা রঙহীন জীবনের গল্প”

  1. Pingback: বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ! | সাহিত্য | অনুলিপি

Leave a Comment