একাকিত্ব | আবুল হাসনাত বাঁধন

একাকিত্ব | আবুল হাসনাত বাঁধন

একাকিত্ব | আবুল হাসনাত বাঁধন

একাকিত্ব আমায় গ্রাস করেছে,
পৌঢ় শরীরের ভাঁজে, যুবক হৃদয়ে গ্রাস করে নিয়েছে।
আমার শুকনো চামড়ার পলেস্তারা ভেদ করে ঢুকে পড়েছে নিঃসঙ্গতা।
বয়স্ক দেহের ভার সইতে সইতে বড্ড বেশি ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়েছে আমার মন;
যৌবনের কোলাহল, হাসি-গান কিছুই আজ অবশিষ্ট নেই,
সর্বত্র জায়গা করে নিয়েছে মৌনতা।

একসময় আমরাও জীবনের গান গাইতাম,
কলমে জেগে উঠত বন্ধুত্বের গল্প,
ডাইরি ভরে যেত অজস্র কবিতায়;
ভালোবাসায় ভরা হৃদয়ে আজ গেঁথে যাচ্ছে শতশত স্মৃতিদুঃখের সুঁচ।

আরও পড়ুন: বাবার চিঠি | আবুল হাসনাত বাঁধন

সপ্তজন্মের পর এখন আমি আর মরি না,
আগে রোজ রোজ মারা যেতাম নিজের ভেতরে;
অনেক বার মরেছি কাদম্বরীর শূন্য দৃষ্টিতে।
আমার আত্মিক মৃত্যু ঘটেছে বহু আগেই,
শুধু যান্ত্রিক দেহটা জীবন্মৃত হয়ে আজো আছে।

আমার বহুবেলা কেটেছে হিমেলের প্রশস্ত কাঁধে হাত রেখে,
সেই নির্ভরতার আলিঙ্গন এখনো মনে পড়ে আমার।
আমি আজো আমাদের হৃদকম্পন শুনতে পাই চোখ বুজলেই।
কর্ণফুলীটা এখনো আমাদের বহু গল্প-কবিতার সাক্ষী।

মুকিতের সাথে হিমু হবার বৃথা চেষ্টা এখনো মনে আছে আমার।
মাঝরাত্রিতে হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে ঢুকিয়ে,
দুজনে বেরিয়ে পড়তাম ব্যস্ত নগরীর ফুটপাতে।
নিয়নের হলুদ আলোয় স্নান করত আমাদের নগ্ন পা;
চান্নিপহর রাতে, নৌকার গলুইয়ে বসে
নদীর জলে আপতিত নীল জোছনা খাওয়ার সময়গুলো আমি এখনো ভুলতে পারিনি।

সাবএরিয়ার অলিতে গলিতে আঁকা আছে আমার আর হিমাংশুর পদচিহ্ন;
প্যারেড কর্ণারের ব্যস্ত মানুষের ভীড় সাক্ষী আমাদের বন্ধুত্বের।
রহমান চাচা বেঁচে নেই;
তবুও তার লেবু চায়ের স্বাদ আমি এখনো ভুলতে পারিনি।
লেকের জলে পা ডুবিয়ে কত বিকেলে কেটেছে আমাদের, কিছুই ভুলতে পারিনি।

আরও পড়ুন: ‘তরুন্বিতা, ফিরবে তো?’ | আবুল হাসনাত বাঁধন

ফারিনকে ‘ব্যাঙ’ ডেকে ক্ষেপানো হয় না আর,
ওর নাকি একটা মেয়ে বাবুর শখ ছিল খুব?
মেয়ে ব্যাঙাচি আদত এসেছিল কিনা জানতে পারিনি কখনো;
সময়ের অনেক গভীরে ডুব দিয়ে
হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা সবাই।

আজ, একাকিত্ব গ্রাস করেছে আমায়,
নিঃসঙ্গতায় পার হয়েছে পুরো একটা যুগ!
বেঁচে আছি, অনাদরে পড়ে থাকা বইয়ের ধূলিমাখা পেলব প্রচ্ছদের মতো!
এ পৃথিবীতে বন্ধু নেই,
নেই হাসি-কান্না, আড্ডা কিংবা গান।
জিয়ল মাছের মতো বেঁচে আছি ব্যাঙহীন এক বদ্ধ ডোবায়,
এখানে হিমেলের অদ্ভুত লেখনী নেই,
নেই শান্তর অশান্ত গানের সুর কিংবা পিয়ার সুরেলা কণ্ঠ।

আমাদের হলদে পাঞ্জাবীটা রঙ হারিয়ে ধূসর ফ্যাকাশে হয়ে গেছে বহু আগেই,
রঙ হারিয়েছে ইমরানের ভুবন কাড়া হাসিটাও।
স্বর্ণার প্রশস্ত কপালে ঝুলে থাকা চুলে নাকি পাক ধরেছিল?
পাক ধরেছিল হিমাংশুর বুদ্ধিজীবী মনটাতেও!

বৃষ্টির শহরে বৃষ্টি নামেনি বহুকাল ধরে,
মসজিদ-মন্দির-গির্জায় আমৃত্যু প্রার্থনা-
এক পশলা ব্যক্তিগত বৃষ্টি নামুক,
ভাসিয়ে দিক সবার কঠিন নিষ্প্রাণ হৃদয়।
ভিক্ষু হবার লক্ষ্যে সুষ্ময় সংসার ত্যাগী হয়েছিল,
কিন্তু আমি? আমি কেন সংসারী হলাম না?
উত্তরটা আজ পর্যন্ত জানতে পারেনি কেউ!

আজ শ্রাবণের নিষ্পাপ ধারা সাক্ষী আছে,
সাক্ষী আছে, ইলেক্ট্রিক তারে বসে থাকা ভেজা কাক;
নিঃসঙ্গতা আমার সর্বস্ব গ্রাস করেছে!
একাকিত্ব পুরোপুরি খেয়ে নিয়েছে আমাকে।

‘একাকিত্ব’ | © আবুল হাসনাত বাঁধন

(১০/০৬/২০১৬)
কোতোয়ালি, চট্টগ্রাম।

উৎসর্গ: আমার সকল বন্ধু-বান্ধবিকে।

আরও পড়ুন: সরলতা | আবুল হাসনাত বাঁধন

*****

বন্ধুত্বের স্মৃতি রোমন্থন করা এ ধরনের আরও নতুন নতুন কবিতা পড়তে চাইলে অনুলিপি সাইটে চোখ রাখুন। যারা স্কুল / কলেজের বন্ধু – বান্ধবিদের এখনো মিস করেন, তারা কবিতাটা শেয়ার করতে পারেন! ধন্যবাদ।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

Leave a Comment