সাহিত্যসোশ্যাল মিডিয়া

পথ শিশু আব্দুল গনির সাথে একদিন

“আব্দুল গনি”
ষ্টেশন গেলাম আজকে মামা- মামীকে রিসিভ করার জন্য। একটা পিচ্চি, বার বার আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়।
ডাক দিলাম, কাছে এলো।
নাম জিজ্ঞাস করলাম, তার নাম আব্দুল গণি। যাক ভালো কথা, আমাকে জিজ্ঞাস করলো আমার বাসা কোথায়!
এরপর তার সাথে আমার যে কথা -বারতা হলো তা রীতিমত আমার জীবন দর্শন বদলে দেয়। খানিকটা এরকম–
–নাম কি তোর?
–আব্দুল্লাহ গনি।
–থাকস কই?
— এইনেই থাকি, আপনের মোবাইল নাম্বার টা দেন।
— মোবাইল নাম্বার দিয়া কি করবি?
— আপনেরে ফোন দিমু।
— তুই কি করস?
— কিছুই করি না, এইনথেইক্কা টেহা তুলি।
পছন্দ হলো কথায়। ১০ টাকা বের করে দিলাম পকেট থেকে। সাধারণত টাকা দিলেই এরা চলে যায়, কিন্তু গেল না ছেলেটা। আবার কথা শুরু।
— আমারে আপনাগো বাসায় লয়া যাবেন?
চিন্তা করতেসি মনে মনে এই হতভাগা আমারি কত ঝড়ঝাপটা পার কইরা থাকা লাগে বাসায়, তরে কেমনে নিমু বাসায়।
— তর বাবা মা নাই?
— বাপ তো নাই,ফালায়া চইল্লা গেসে, মা আসে, আর একটা ছোট বোন আসে।
–মা কই?
–মা ঢাকা কাম করে।
–তুই এইনে কেমনে আইলি? দেশের বাড়ি কই?
–দেশের বাড়ি শরিয়তপুর,মা রে কয়া ট্রেন দিয়া চইলা আইসি, মমেসিং আইতে গিয়া ভুলে গেসিলাম গা রাজশাহী, পরে অইনথেইক্কা আইসি এইনে।
— মা জানে তুই এইনে? খুঁজব না তরে?
— মা জানে এইনে আসি, আইসিলো কালকে, দেখতে আমারে।
— আমি কাম করুম ভাই, আমারে নিবা?
বলে রাখি ওর ডান হাতটা একদম অচল,
বয়স ১০-১২ এর বেশি না।
— কি কাজ করবি তুই?চায়ের দোকানে করবি কাজ?
— (ডান হাত দেখিয়ে) ভাই চা যদি পইরা যায় হাতে?আমি বাদাম বেচমু ভাই।
ভাবলাম বন্ধু-বান্ধব সবাই মোটামুটি হেল্পফুল।এই ছেলেটার জন্য কিছু করা যাবে হয়তো।
— এইটা পারবি তুই?
— পারমু ভাই, তুমিই কও।
— তরে খুইজা পামু কেমনে?
আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল টিকেট কাউন্টার এর সামনে, আমি এইনেই থাকি।
–এইনে আইসা নাম কইলেই চিনবো তরে?
–দুই একজন চিনবো। তুমার নাম্বারডা দেও।
–নাম্বার কেমনে দিমু? কাগজ কলম তো নাই সাথে।
— তুমি তেইলে কবে আইবা কও?বাসাত নিবা আমারে?
–আমার তো ভাই অনেক ভেজাল, ব্যস্ত থাকি, যা পরশুদিন আমু নে, দেহি তর লাইগা কিছু করতে পারি কিনা!
হঠাৎ করেই বললো,
— আমি কিন্তু নেশা করি না, সব পুলাপাইন এর মতো।
— তরে কেউ কয় নেশা করতে?
–পুলাপাইন অইযে খায় না? আমারে কইসে একদিন।আমার এডি ভয় লাগে ভাই, আল্লার কসম।
— আপনে গরীব মাইনশেরে আদর করুইন না? আমারে করলাইন যে।
কখন যেন একবার মাথায় হাত বুলায়া দিসিলাম, অইটা ভেবেই হয়ত বললো।
— আমিও গরীব ভাই।
–দেইখা বড়লোক মনে অয়।
হাসলাম, বেচারা যদি আজ হূমায়ুন আহমেদ এর বই গুলা পড়ত তেইলে আমি যে মধ্যবিত্ত তা খুব করে বুঝতো, যাক কথা শুনে হাসলাম।
— বড়লোক হলে তরে আজকে ৫০০০ টাকা দিয়া যাইতাম গা।
–৫০০০!?
— আল্লাহ যাগোরে টাকা দেয় হেগোরে মন দেয় না, আর যাগোরে মন দেয় তাগোরে টাকা দেয় না।কথাটা সে কতটুকু বুঝলো জানি না, শুধু মাথা নাড়ালো।
— ভাইয়ের কি টাচ মোবাইল?
— হু।
— কেডা কিন্না দিসে?
— আম্মু।
— মোবাইল দিয়া কি প্রেমিকার সাথে কথা কইন?
— হেহে, বলি।
— সুন্দর?
— তোরে দেখাই, পরে তুই ই বল।
ফোন বের করে দেখালাম একটা ছবি।
— অনেক সুন্দর চেহারা।
— একদিন নিয়া আসব নে।
— হে কি আমারে আদর করব? নাকি বহা দিব?
— নাহ, তরে আদর করব।
তবে কথোপকথন এর বেস্ট পার্ট ছিল এইটা;
— তরে যে আমি ব্যবসা লয়া দিমু, টাকা দিয়া কি করবি?
–তুমিই কও, তোমার কাসে জমায় রাখমু।
— বড় হয়া কি হবি?
— ভালা মানুষ হইবার চাই।
আমি জাস্ট হা করে কয়েক সেকেন্ড তাকায় থাকলাম কথাটা শুনে।
বললাম চল তরে কিছু খাওয়াই।
— না ভাই, পেট ভরা।
–আরে চল,পরে খাইস।
নিয়ে গেলাম, সে রুটি খাবে না, একটা বন রুটি খাবে। একটা বন রুটি শুধু।আমি একটা লাড্ডুও দিলাম।
— ভাই, এই দশ টাকাটা লাগবো না।
–ক্যান?
— আমার পিসে তুমি ২০ টেহা খরচ করলা।
— তরে হিসাব করতে কইসি?তুই হিসাব পারস? বলতো ১০ যোগ ১০ কত?
–২০ টেহা।
এরপর অনেক হিসাব তাকে জিজ্ঞাস করলাম, ১০০ পর্যন্ত খুব ভালোই পারে হিসাব।
— ভাই, তুমি আবার আইবা তো?
— আল্লায় বাচায়া রাখলে আসমু।
এর মধ্যে আরও অনেক কথাই ছিল, এতটা গুছিয়ে লিখতে পারি না বলে লিখা হলো না, আলস্য।
ট্রেন চলে এলো, মামারা নামলো।
গনি আমার পেছনেই দাঁড়িয়েছিল।
স্টেশন থেকে পিছু পিছু এলো অনেক দূর।
পকেট থেকে বাসায় ফেরার অটো ভাড়ার টাকাটা রেখে যা ছিল তাই দিয়ে দিলাম,
খুব সুন্দর করে খোদা -হাফেয বললো।
গনির জন্য আমি কিছু করতে চাই, তবে আমি খুবই নগণ্য একটা মানুষ, একার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব না, কারও যদি হেল্প করার ইচ্ছা থাকে, তবে আমার সাথে ষ্টেশন যেতে পারেন আপনার সুবিধা মতো একদিনে।

 

লেখাঃমোহতাসিম সাদমান খান শিক্ষার্থীঃব্যবস্থাপনা বিভাগ,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button