পহেলা বৈশাখ এবং আমরা

পহেলা বৈশাখ এবং আমরা

আমরা অন্যরকম একটি শৃঙ্খলা। আমাদের ধর্মে, কর্মে, শিক্ষায়, ভালোবাসায়, চালচলনে, আচার-ব্যবহারে সবকিছুতেই একই শৃঙ্খলার ছাপ রয়েছে। সেই শৃঙ্খলার নাম বাঙালি শৃঙ্খলা। যদিও আজকাল আর আগের মতো জনে জনে পাজামা, পাঞ্জাবি, ধূতি, শাড়ি, ফতুয়া গায়ে দিয়ে চলাফেরার সুন্দর দৃশ্য দেখা যায় না। তারপরও কোনো এক সুন্দর দিনে সবাইকে একই সাজে রাস্তায় দেখা যায়। এটা বাঙালির সর্বজনীন শৃঙ্খলা, সর্বজনীন লোকউৎসব পহেলা বা পয়লা বৈশাখ অথবা বাংলা নববর্ষ। আর সেই দিনে মুখে মুখে উচ্চারিত শুভেচ্ছা বাক্য ‘শুভ নববর্ষ’। প্রথম বঙ্গাব্দ, বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম, গ্রীষ্মের প্রথম দিন, বঙ্গাব্দের প্রথম মাস বৈশাখ, বৈশাখের প্রথম দিন হচ্ছে পহেলা বৈশাখ! আর তাই এইদিনে অনেক ব্যবসায়ী নিজের ব্যবসার হিসেবও সাজিয়ে থাকেন নতুন করে। বাংলাদেশি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এ ছাড়া ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালি এই উৎসবে অংশগ্রহন করে থাকে।

পহেলা বৈশাখ সম্পর্কিত কিছু সুন্দর সুন্দর তথ্য:

বাৎসরিক এই লোকউৎসবের আনুষ্ঠানিক নাম পয়লা বৈশাখ। এর অন্য নাম নববর্ষ। বাঙালি জাতি কর্তৃক পালিত এই উৎসবের উপাসনার রং ‘রংধনু’। জাতিগত তাৎপর্যের এই লোকউৎসবে উদযাপিত হয় ‘হালখাতা’, ‘বৈশাখী মেলা’। বাংলাদেশে ১৪ই এপ্রিল এবং ভারতে ১৫ই এপ্রিল পালিত হয় এই দিন। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ই এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৫ই এপ্রিল এই লোকউৎসব পালিত হয়। নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকেন অনেক ব্যবসায়ীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়ে থাকে এই দিনে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই উৎসব শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।

একটা সময়ের বৈশাখ:

একটা সময় এই উৎসব ছিল ঋতুর উপর নির্ভরশীল কারণ তখন এর তাৎপর্য ছিল শুধুই কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগ না থাকার ফলে কৃষকেরা ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে। কিন্তু আজ এই উৎসব সর্বজনীন লোকউৎসব হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন: বই এবং বই পড়া!

বৈশাখ উৎপত্তির প্রেক্ষাপট:

মুঘল সাম্রাজ্যের সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। হিজরি সন যেহেতু চাঁদের ওপর নির্ভরশীল তাই কৃষি-ফলনের সাথে কোনো মিল ছিল না! তাই খাজনা দেওয়া তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ত। তাই কৃষকদের অসময়ে খাজনা দিতে হতো। এই জায়গায় ভালো একটা মিসরুল / বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় মুঘল সম্রাট আকবর একটি শৃঙ্খলা আনতে চাইলেন। খাজনা আদায়ে সুন্দর শৃঙ্খলা প্রণয়নের জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। অবশ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সৌর সন এবং হিজরি সালের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন বাংলা সন। ১৫৮৪ সাল থেকে এই গণনা শুরু করা হয়। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ‘ফসলি সন’ পরে অবশ্য এর নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গাব্দ’।

উদযাপন রীতি:

মুঘল সম্রাট আকবরের আমল থেকেই এই উৎসব উদযাপিত হয়ে আসছে। দেখা যায় চৈত্র মাসের শেষের দিকে সকল কৃষকশ্রেণীর মানুষ সকল প্রকার খাজনা প্রদান করতেই হতো। আর বৈশাখের প্রথমদিন সবাই ভূমি মালিকের দ্বারা মিষ্টিমুখ করত। এই বিষয়টি ধীরে ধীরে সামাজিক রীতি হয়ে ওঠে। বিশেষ এইদিনের সবচেয়ে বিশেষ পর্ব ছিল হালখাতা। (হালখাতা মূলত ব্যবসার নতুন হিসেব অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে)। তবে আধুনিক উদযাপন একটু ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে দেখা যায়! ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে পূজার ব্যবস্থা করা হয় আবার ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ বিষয় লক্ষ্য করা যায়।

সবশেষে:

নতুন বছরের এই সর্বজনীন লোকউৎসবের সাথে জড়িত বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। ওইদিন সকালের ক্লাইমেক্সটি হয় এরকম – ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবকিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, গায়ে বৈশাখী জামা দিয়ে রংধনুর সাতরঙা চিন্তা মাথায় ইনপুট দিয়ে যাওয়া হয় বন্ধু-বান্ধবদের বাসায়, ‘বৈশাখী মেলায়’, সোনারগাঁ’র ‘ঘোড়া মেলায়’, সোনারগাঁওয়ের ‘বউমেলায়’ কত সুন্দর স্বকীয় উদযাপনে। এই বিষয়টি আমাদেরকে বারবার বাঙালি বানিয়ে একই লোক, ফোক, গোষ্ঠীতে দাঁড় করিয়ে দেয় যেখানে বিস্তার করে প্রাণে প্রাণে প্রাণ-সংযোগ। অস্তিত্বের সাথে অস্তিত্বের এই স্বকীয় মিলনই বৈশাখ।

অগ্রীম শুভ নববর্ষ ১৪২৮ বঙ্গাব্দের শুভেচ্ছা!

তানজীভ সারোয়ার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

7 Comments

  1. অনুলিপিতে কিভাবে লেখা পাঠানো যায়…একটু জানতে চাই

Leave a Reply

Back to top button