ছোট গল্প

বিশ্বাস করা ভালো,অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ

মানুষের মুখে বলতে শুনেছি,পৃথিবীটা নাকি বিশ্বাসের ওপর টিকে আছে।কথা টা সত্যি।
বিশ্বাস না থাকলে পৃথিবীতে টিকে থাকা টা কঠিন হয়ে যেতো। তবে আজ আপনাদেরকে একটি অন্ধ বিশ্বাসের গল্প শুনাবো চলেন…….

খুব ছোট্ট বেলা মেয়েটার মা মারা গেছে। ছোট্ট বলতে ৭ বছর বয়সে রুপার মা মারা যায়। তারপর থেকে মেয়েটার কথা চিন্তা করে তার বাবা ফকরুল দ্বিতীয় বার আর বিয়ে করে নি।

এই ভাবে ই চলতে ছিলো বাবা আর মেয়ের সুখী জীবন।
রুপা সম্ভবত তখন মাত্র এস.এস.সি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছে। বেশি মেধাবী না হলেও ছাত্রী হিসেবে মোটামুটি ভালোই ছিলো। কলেজে কিছুদিন ক্লাস করার পর সোহাগের সাথে পরিচয় হয় তার।সোহাগ আর রুপা একই কলেজের স্টুডেন্ট তবে সোহাগ ছিলো রুপার এক ব্যাচ সিনিয়র অথাৎ রুপা ফার্স্ট ইয়ারে আর সোহাগ সেকেন্ড ইয়ারে।
রুপা মেয়েটা ছিলো নিতান্তই সহজসরল। এই কয়লার পৃথিবী সম্পর্কে তার এতো বেশি ধারনা ই ছিলো না। নিজে যেমনটি সহজ এমন সহজ করেই নিজের চিন্তাধারা গুলো সাজাতো নির্মল নিষ্পাপ মনে বাহিরের জগৎ সম্পর্কে।
সোহাগ ছিলো মোটামুটি মেধাবী শিক্ষার্থী। তার ইচ্ছে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে।

এই ভাবে একসাথে চলতে চলতে একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। তবে সেটা প্রকাশ করে না রুপা। একটা কথা আছে না যে,”মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না” ঠিক সেই রকম ই আরকি।

রুপার কিছু না বলা দেখে, সোহাগ ই একদিন রুপা প্রপোজ করে। রুপা তো অবাক নিজের প্রছন্দের মানুষের থেকে প্রেম নিবেদন পেলে যেমন টা অবাক হবার কথা ঠিক তেমনটা ই।

ভালোই চলছিলো তাদের প্রেম। রুপা প্রাইভেট পড়তো সকাল ভোরে আর সোহাগ পড়তো সকাল ৮/৯ টার দিকে। শীতের সকালে কুয়াশা ভেজা ভোরে সোহাগ নিজের সাইকেলে করে রুপাকে প্রাইভেটে দিয়ে আসতো। সারা দিন কলেজ সুযোগ পেলেই দুজন এক সাথে সময় কাটাতো আবার সারা রাত জেগে জেগে ফোনে কথা বলতো। পরদিন দুজনেই ক্লাসে এসে ঝিমাত।

সে দিন খুব বেশি কুয়াশা পরেছিলো। যেদিন সোহাগ জীবনে প্রথম কোনো নারীকে প্রেম রুপে স্পর্শ করেছিলো।রুপার ক্ষেত্র ঠিক তেমনি ছিলো। কোনো পুরুষের প্রথম স্পর্শ।
এ ভাবে মধুর সম্পর্ক চলতেছিলো তাদের।
রুপা মনে মনে চিন্তা করতো যে সোহাগ কোনোদিন ই তাকে ছেড়ে যাবে না। বিশ্বাস কি সে ছিলো অন্ধ বিশ্বাস।

দেখতে দেখতে সোহাগে এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসে। রুপা এক ক্লাস ছোট হলেও পরীক্ষার সময় সোহাগ কে অনেক সাহায্য করেছে।

এইভাবে পরীক্ষা শেষ হবার পরে সোহাগ ঢাকা যাবে এডমিশন টেষ্ট এর জন্য কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে। কিন্তু সোহাগের পরিবার ছিলো মধ্যবিত্ত পরিবার। টাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে একদিন রুপার কাছে এসে সোহাগ কান্না করতে করতে বলে যে সে আর পড়াশোনা করবে না। পরিবার ও চায় না যে সোহাগ পড়াশোনা করুক কারন তখন তার পরিবারের অবস্থা ছিলো করুন। সোহাগের চোখে পানি দেখে রাতে গুমাতে পারে নি রুপা।

সে শুধু সোহাগ কে ভালোবাসতো না বরং অন্ধ বিশ্বাস ও করতো। যার জন্য নিজে মৃত মায়ের রেখে যাওয়া গয়না, বাবার অজান্তে রাতে চুরি করে পরের দিন সোহাগ কে দেয়। সোহাগ প্রথমে গয়না গুলো নিতে চায় নি। তারপর রুপা সোহাগ কে বলে যে, দেখো বিয়ের পর তো এগুলো আমারি হবে। আর যা আমার তাই তো তোমার। তুমি না হয় বিয়ের পর আমাকে এরচেয়ে অনেক বেশি গয়না কিনে দিও। এই কথা শুনে সোহাগ রুপাকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো। আর বললো রুপা তুমি আমাকে এতোটা ভালোবাসা? সারা জীবন এতটা ভালোবাসবে তো আমায়? রুপা বললো আমি সারাজীবন তোমাকেই ভালোবাসবো তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেওনা। সোহাগ বললো ধুর পাগলী এই বলে শক্ত করে আবারো বুকে জড়িয়ে ধরলো।

তার কিছুদিন পরে সোহাগ ঢাকা চলে গেলো। সোহাগ লেখাপড়ায় অনেক ব্যস্ত হওয়ায় রুপার সাথে আর আগের মতো কথা হয় না। তবে প্রতিদিন ই যোগাযোগ হয়।হঠাৎ সোহাগ চলে যাওয়ায় রুপার আগের মতো লেখাপড়ায় মন বসে না।তাও সে সবসময় সোহাগ কে ফোন করে না। এই চিন্তা করে যে ওর লেখাপড়ায় সমস্যা হবে।

সোহাগ ঢাবিতে পরীক্ষা দিলো কিছুদিন পরে রেজাল্ট আউট হলো যে সোহাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে।
এই খবর শুনে রুপা যে কি মহাখুশি। এই ভেবে যে আমার সোহাগ ঢাবিতে চান্স পেয়েছে এখন আর কোনো সমস্যা নেই বাবাকে বললে বাবাও মেনে নিবে আমার সোহাগ কে।সোহাগ কে নিয়ে তার অন্ধ বিশ্বাস ছিলো অটল।
তবে এই খুশির স্থায়িত্ব বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে নি।

ঢাবি তে চান্স পাওয়ার কিছুদিন পার না হতেই সোহাগ রুপার সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করে না। ফোন দিলে ফোন রিসিভ করে না। এস এম এস করলেও ঠিক মতো রিপ্লাই দেয় না।
এদিকে মেয়ে টা সারাদিন কি যে ছটফটানি করে। তবে কাউকে বুঝতে দেয় না।
কেউ একজন বলেছিলো যে,”প্রিয় মানুষের অবহেলা মৃত্যু থেকেও নাকি ভয়ংকর” সেটা বোধহয় আজ সে বুঝছে।

অনেক চেষ্টা করার পর সোহাগ তাকে একদিন ফোন দেয়। রুপা যে কি মহাখুশি এই চিন্তা করে যে আমার সোহাগ আমাকে ফোন করেছে। যে সোহাগ রুপার সাথে ঠিকমতো একরাত কথা না বলতে পারলে পাগলের মতো করতো সে সোহাগ!
সে দিন অনেক কথা বলার পর সোহাগের শেষ কথা ছিলো যে,”তোমার সাথে আমার আর রিলেশন রাখা সম্ভব না,সামনে আমার পুরো ক্যারিয়ার পরে আছে,ফ্যামেলি কে দেখতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি” অথাৎ কাউকে ছেড়ে দিতে হলে যা যা বলে আরকি সব ই বলেছে।

রুপা বললো তাহলে কি আমায় এই তিন বছরের সকল প্রেম কি মিথ্যা ছিলো? তুমি কি সব অতীত ভুলে গেলে সোহাগ?
সোহাগ বললো Past is past সব ভুলে যাও।
রুপা বললো আমি যে নিজর মৃত মায়ের গয়না বিক্রি করে তোমাকে ঢাকা পাঠালাম সেটা কি ভুুলে গেলে সোহাগ?

সোহাগের উত্তর টা ছিলো হৃদয় বিদারক। উত্তর ছিলো এই যে,”সেদিন তোমার কাছে গয়না ছিলো তা বিক্রি করে আমাকে হেল্প করেছো,সে দিন তুমি হেল্প করেছো তাই অন্য কারো কাছে যাইনি। অন্য কারো কাছে গেলে সে এই হেল্প টুকু এমনেতেই করতো সো এটা বলার মতো কিছু না সিম্পল একটা বিষয়”

সোহাগের কাছে এইরকম উত্তর শুনে রুপা আর একটি কথাও বলেনি। এর পর থেকে রুপা সোহাগ কে আর কোনো দিন ফোন করে বিরক্ত করে নি।
আসলো কথা হলো সোহাগ ঢাবির কলা অনুষদের মেয়ে জুথী নামে একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে রুপাকে অবহেলা করে ।

এর কিছুদিন পরে সোহাগ বাড়িতে আসে। এসে শুনতে পায় যে রুপা নাকি কিছু দিন আগে আত্নহত্যা করে মারা যায়। আত্নহত্যা করার আগে একটি চিরকুটে “সরি বাবা”বলে মারা যায়। এবং তার রুমের দেয়ালে বড় করে লিখে দিয়ে যায় যে “বিশ্বাস করা ভালো, অন্ধ বিশ্বাস করা পাপ”

তার এই মৃত্যু তার বাবা মেনে নিত পারে নি। এর কিছু দিন পর অথাৎ রুপার মৃত্যুর কিছু দিন পর তার বাবা স্ট্রোক করেন, এতে তার ডান হাত এবং বাম প্যারালাইসেস হয়ে যায়। এর পরে কি হয়েছিলো আর জানা যায় নি।

তবে এতটুকু শোনা গেছে যে, সোহাগ যে মেয়েটির জন্য রুপাকে ছেড়ে দিয়েছিলো সে মেয়েটি সাথে তার ৪ বছর প্রেম হবার পর মেয়ে টি বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে অন্য এক ছেলেকে বিয়ে করেছে।

এটা ই বোধহয় “Revenge of nature”.

লেখাঃফকির মুহাম্মদ শুভ ইসলাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button